 |
| ছবি ১- ভয়াল সেই রাতের বিভীষিকা |
আজ সেই রক্তাক্ত ছাব্বিশে মার্চ, যেদিন এই বাঙালী জাতির উপর হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সমর বাহিনী। বাঙালী জাতি সেদিন তাদের রুখে দাঁড়ানোর কোন পথই খুঁজে পায়নি। নিরীহ কোপত এর কাঁটা পড়েছিল কষাই এর হাতে। ভয়াল সেই রাতের একটি চিত্র আমরা পাশের ছবিটিতে দেখতে পাই।
আসলে আমার এ লেখা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সবাইকে আবার নতুন করে জানানোর ইচ্ছা নিয়ে লেখা নয়। ইতোমধ্যে এ কাজ অজস্রবার হয়েছে। আমার এ লেখা মূলত স্বাধীনতাত্তোর আমাদের অর্জিত মূল্যোবোধ নিয়ে।
 |
| ছবি ২- ভয়াল সেই রাতের বিভীষিকা |
 |
| ছবি ৩- ভয়াল সেই রাতের বিভীষিকা |
স্বধীনতা অর্জনের চল্লিশ বছর তো হতে চলল, কিন্তু আমরা বাংলাদেশি হিসেবে এখন পর্যন্ত কি শিখলাম? আমরা কি আদৌ, জাতি হিসেবে একতাবদ্ধ? আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা তো প্রতিনিয়তই রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের সমালোচনা করতে করতে মুখের ফেনা তুলে ফেলি, কিন্তু এই আমরা এই সাধারণ মানুষেরাই যে বিভিন্ন উপকরণের দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদে বিভক্ত হয়ে বসে থকি, তার জন্য আমরা কার কাছে দায়ী থাকব, আর এ ব্যাপারে কে ই বা আমাদের সমালোচনা করবে? প্রতিটা ক্ষণ, প্রতিটা ক্ষেত্রে আজ আমরা দ্বিধাবিভক্ত। আজ পর্যন্ত আমরা ঠিক করতে পারিনি, আমরা কি 'বাঙালী' জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে চলব না কি 'বাংলাদেশি' জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে চলব? এদেশের মুক্তিকামী ও কর্মঠ সাধারণ মানুষ আজ এই 'জাতীয়তাবাদ' দোটানায় রয়েছে। এদেশের জাতীয়তাবাদ সচেতন এবং অসেচতন মুসলিমরা রয়েছে আরেক জাতীয়তাবাদের খপ্পরে। বিভিন্ন প্রচারে এবং অপপ্রচারে তারা ঠিক করে উঠতে পারে না যে তারা কি 'মুসলিম' জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজ গঠন করবে কি না? সব কিছু মিলিয়ে এ কথা আজ বলাই যায় যে আমরা 'জাতীয়তাবাদ' এর মহাসংকটে রয়েছি। এবং এটা অনস্বীকার্য যে এই মহাসংকট আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচরণকে করবে উচ্ছৃংখল যার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ হলো, দূর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে পৃথিবীতে বাংলাদেশের মাথা হেঁট করা। আমরা পৃথিবীতে বর্তমানে অন্যতম দূর্নীতিবাজ দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচিত। দূর্নীতিবাজ হওয়ার এই দায় আমরা একে অপরের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টার কোন ক্রটি রাখি না, কিন্তু কেউ-ই মাতৃসম এদেশকে মন থেকে ভালোবেসে একে কলুষমুক্ত করতে এগিয়ে আসি না। আর যদি কেউ অন্যভাবে এদেশের একটি সুন্দর ভাবমূর্তি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে, তাকেও আমরা অন্ধকার রাজনীতির কালো থাবায় সংগে সংগে গ্রাস করতে সচেষ্ট হই। অনেকেই হয়তো এ ব্যাপারগুলোকে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করবেন, কিন্তু হজম করতে কষ্টকর হলেও এটাই সত্যি যে আমরা সবাই- ই শুধুমাত্র আমাদের স্বার্থরক্ষা করতেই কাজ করে যাই এবং এদশের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার কারও কোন ইচ্ছাই নেই। আর যদি কারও সেই ইচ্ছা ভুলক্রমে কখনো হয়ে থাকে তবে তার সেই ইচ্ছাগুলি আকাশে ডানা মেলে পাখি হয়ে উড়াল দেয়ার আগেই সবাই একত্র হয়ে কেঁটে ফেলি। আসলে এটাই হচ্ছে আমাদের জাতীয় ঐক্যসিদ্ধ একমাত্র জায়গা যে আমরা আমাদের দূর্নীতিগুলোকে ব্যাখ্যার আড়ালে- আবডালে পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলি আর অন্যের ভাল কাজেরও কখনো কোন মুল্যায়ন করি না, যার ফল হলো কৈশোর অবস্থাতেই প্রত্যেকটা বাংলাদেশির মন থেকে দেশপ্রেম চিরকালের জন্য পলায়ন।
সামাজিক নেটওয়ার্ক 'ফেইসবুক' এর মাধ্যমে অনেক অনেক জানা- অজানা বন্ধুদের ধ্যান- ধারণার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলে এখন প্রতিনিয়ত। বেশিরভাগ বন্ধুদের সেইসব ধ্যান- ধারণগুলো পড়ে বারবার আমার মনে হয়, কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম ফাঁক রয়ে গেছে। সবাই যেন কেমন একটা জাতীয়তাবাদের সংকটে রয়েছে তাদের অজান্তেই। তাই আজ আমার এটা খুব বেশি করে উপলদ্ধি হচ্ছে যে, আমাদের দেশপ্রেমের কমতি এবং দেশের ভাবমূর্তি নষ্টকারী কাজ করতে দ্বিধাবোধ না করার পিছনে একটা কারণই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর তা হলো জাতীয়তাবাদ নিয়ে আমাদের আত্নিক দ্বন্দ। আর যে দেশের মানুষের জাতীয়তাবোধেই সমস্যা, সে দেশের মানুষদের কাছে দেশপ্রেমই বা আশা করি কি করে? আমরা হয়তো এই জাতীয়তাবোধের দ্বন্দের জন্য আবারও ঘুরে-ফিরে সেই দূষিত রাজনীতিকেই দায়ী করব, কিন্তু শুধু কি তারাই দায়ী? যে কোন রাজনৈতিক সংগঠনই গঠিত হয় আপনার- আমার মত অগণিত সাধারণ মানুষ নিয়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলো যদি কোন দোষে দুষ্ট হয়, তার কিছুটা দায়ভার নিশ্চিতভাবেই আমাদের উপর কিছুটা হলেও বর্তায়। তার চেয়েও বড় কথা, আমাদের 'স্বত্তা' কি এতটাই দূর্বল যে আমরা কোন কিছু নিজের মত যাচাই না করে যে যা বলল, তাতেই নিজের বিবেককে তৈরি করে ফেলি। মুক্তভাবে বাঁচতে শেখা এদেশের মানুষের আজ কেন এ অবস্থা হবে? তাহলে কি এটাই বুঝে নিব, স্বাধীনতার ছোঁয়া আজ আমাদের কাছে অনাকাঙ্খিত?
© ইনামুল হাফিজ লতিফী
enamul.hafiz.sust@gmail.com